ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ হাজার ৮১১ জনে দাঁড়িয়েছে। রিখটার স্কেলে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুই দফা শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে আহত হয়েছেন প্রায় ১৭ হাজার মানুষ। গত ২৪ জুনের এই বিধ্বংসী দুর্যোগের দুই সপ্তাহ পর আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিলেও, স্বজনরা এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের লাশ খুঁজে চলেছেন। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লা গুয়াইরার কারাবালেদা এলাকায় বহু আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, যার ফলে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। ধসে পড়া ভবনের চারদিকে এখন পচনধরা লাশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে এবং সেখানে মোতায়েনরত সেনাসদস্যদের মতে, এখন কেবল লাশ উদ্ধারের কাজই বাকি রয়েছে। এই দুর্যোগের ফলে দেশটির অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার, যা ভেনেজুয়েলার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ছয় শতাংশের সমান। এমনকি কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে এখনো বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হয়নি।
এই চরম মানবিক সংকটের মুখে ভেনেজুয়েলা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আগামী corkay ছয় মাসে ১৩ লাখ মানুষের জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করতে ২৯ কোটি ৬০ লাখ (প্রায় ৩০ কোটি) মার্কিন ডলারের জরুরি তহবিল চেয়ে আবেদন জানিয়েছে জাতিসংঘ। দুর্যোগ বিষয়ক এক বৈঠকে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার ইতোমধ্যে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া দাতা দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এদিকে ভয়াবহ এই বিপর্যয় ও উদ্ধার কার্যক্রমে অর্থ জোগাড় করতে কারাকাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাদের জব্দ করা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও হিসাবগুলো মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের বৈঠকে ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল অভিযোগ করেন যে, অবৈধ নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্রের মালিকানাধীন একাধিক ব্যাংক হিসাব জব্দ রয়েছে, যা এখন পুনরুদ্ধার কাজের স্বার্থে দ্রুত ছেড়ে দেওয়া উচিত। একই সাথে, যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে আটকে থাকা প্রায় ৩০ টন রাষ্ট্রীয় স্বর্ণ ছাড়ের অনুরোধ জানিয়ে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজ। তিনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে স্পষ্ট জানান যে, এই স্বর্ণ ভেনেজুয়েলার জনগণের এবং ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এটি অত্যন্ত জরুরি।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সাল থেকে তৎকালীন নিকোলাস মাদুরোর বামপন্থী সরকারকে অবৈধ বিবেচনা করে চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর ব্যাপক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর কারাকাসের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেজকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ উন্নয়নের সুবিধার্থে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে। বর্তমান জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম সহজ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে চার মাসের জন্য কয়েকটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নিয়েছে। এই আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সহায়তার আশ্বাসের মধ্যেই দুর্গত এলাকায় তীব্র খাদ্য ও পানি সংকট দেখা দিয়েছে। ঘরবাড়ি হারানো হাজারো মানুষ বোতলজাত পানি, ডায়াপার ও সামান্য শুকনো খাবারের জন্য অপেক্ষা করছেন। প্রিয়জনদের হারানোর তীব্র শোক আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকা মানুষেরা এখন কেবলই ত্রাণের আশায় দিন গুনছেন।

