ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষযাত্রাকে ঘিরে সোমবার তেহরানে লাখো মানুষের সমাগম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৮৯ সালে তার পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজা ও দাফনে ঘটে যাওয়া প্রাণঘাতী বিশৃঙ্খলার পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার বিশেষ সতর্কতা নিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। দুই দিন ধরে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয় খামেনির মরদেহ। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টাব্যাপী রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করবে শেষযাত্রা। তেহরান থেকে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজায় প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিল। সেই সময় জনতার চাপে পদদলিত হয়ে ১০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং আহত হন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবার মরদেহের কফিন ও জনতার মধ্যে বিশাল কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে আলাদা নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে শেষযাত্রার সময় সাধারণ মানুষ কতটা কাছে যেতে পারবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ১৯৮৯ সালে শোকাহত জনতা খোমেনিকে বহনকারী যান ঘিরে ফেলায় তার কাফনের কাপড় ছিঁড়ে যায় এবং মরদেহ মাটিতে পড়ে গেলে পরে হেলিকপ্টারে করে তাকে দাফনের স্থানে নেওয়া হয়েছিল।
রোববার হাজারো মানুষ গ্র্যান্ড মোসাল্লায় গিয়ে আলী খামেনি এবং তার পরিবারের চার সদস্যের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত ইসরাইলি বিমান হামলায় তারা সবাই নিহত হন। সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব দেওয়া আলী খামেনিকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর নিজেদের দৃঢ় অবস্থানও তুলে ধরতে চায় ইরানের কর্তৃপক্ষ।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ, যিনি খামেনি-পরবর্তী সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে বিবেচিত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘গর্বিত ও অদম্য ইসলামী ইরানে জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের শহীদ নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে।’ সোমবারের শেষযাত্রার পর মঙ্গলবার ধর্মীয় নগরী কোমে, বুধবার ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায় একই ধরনের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের নিজ শহর মাশহাদে আলী খামেনিকে দাফন করা হবে।
রোববারের অনুষ্ঠানে আলী খামেনির তিন ছেলে বিরলভাবে জনসমক্ষে উপস্থিত হলেও তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে দেখা যায়নি। বাবার নিহত হওয়ার পরপরই তাকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হলেও তিনি এখনো প্রকাশ্যে আসেননি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিমান হামলায় তিনি আহত হয়েছেন। তবে তার আঘাত কতটা গুরুতর, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
শক্তিশালী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর নতুন কমান্ডার আহমাদ বাহিদিও রোববার দ্বিতীয়বারের মতো শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় তার পূর্বসূরি নিহত হওয়ার পর পুরো যুদ্ধকালেই তিনি জনসমক্ষে ছিলেন না। একই অনুষ্ঠানে আইআরজিসির বৈদেশিক অভিযানের দায়িত্বে থাকা কুদস ফোর্সের প্রধান ইসমাইল কানিকেও বিরলভাবে প্রকাশ্যে দেখা যায়। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের জীবিত কোনো সাবেক পূর্বসূরিকে এখন পর্যন্ত এসব অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি। তাদের সবার সঙ্গেই আলী খামেনির সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল বলে জানা গেছে।
গত জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি। সেই বিক্ষোভ কঠোর দমন-পীড়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনার পর সরকারের প্রতি জনসমর্থনের বার্তা তুলে ধরতেও এই ব্যাপক জনসমাগমকে গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতার পর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আপাতত স্থগিত থাকলেও, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই প্রয়োজনে আবার সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। ফলে শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানগুলোতে প্রতিশোধের দাবিও বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।
রোববারের প্রার্থনা অনুষ্ঠানে ৩৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি, যিনি নিজের পদবি মিরেমাদি বলে পরিচয় দেন, এএফপিকে বলেন, ‘খামেনির হত্যাকারীদের অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।’ ৩৯ বছর বয়সী এক নারী, যিনি নিজের পদবি বাকান্দ বলে জানান, বলেন, ‘আমরা আমাদের বিপ্লব ও নেতার পাশে আছি। আমাদের প্রিয়জনদের রক্তের প্রতিশোধ চাই।’
আলী খামেনি দীর্ঘদিন পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সংঘাতের নীতি অনুসরণ করেছেন। তেহরান বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহও রয়েছে। উভয় সংগঠনই তার শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে।

